নভেম্বর ২০১৬ সালের কথা। আমি তখন একটি প্রিন্টিং কোম্পানিতে প্রজেক্ট ম্যানেজার হিসেবে কাজ করতাম। বাইরে থেকে চাকরিটা স্থির ও ভালো মনে হলেও, ভিতরে আমি দমবন্ধ হয়ে পড়েছিলাম। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, ভারী কাজের চাপ, আর বসের লাগাতার তাগিদ—সব মিলিয়ে জীবনটা রোবটের মতো হয়ে গিয়েছিল।
আমি চাচ্ছিলাম স্বাধীনতা—একটা এমন কাজ, যেটা আমাকে আয়ও দেবে, আবার পরিবার ও প্রিয়জনদের জন্য সময়ও। কিন্তু আমি উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করিনি, তাই নতুন সুযোগ খুঁজে পাওয়া কঠিন মনে হচ্ছিল।
ফ্রিল্যান্সিংয়ের খোঁজ পাওয়া
এক রাতে, অনলাইনে সুযোগ খুঁজতে গিয়ে ফ্রিল্যান্সিং শব্দটার সাথে পরিচিত হলাম। বাসা থেকে কাজ করা, ক্লায়েন্ট বেছে নেওয়া আর নিজের বস হওয়া—এই ভাবনাগুলোই আমাকে অনুপ্রাণিত করল।
আমি কাজ শেখা শুরু করলাম। অফিস এর পাশাপাশ শেখা সহজ ছিলনা, তবে আমি হাল ছাড়িনি। তিন মাসের মধ্যেই আমি Fiverr-এ অ্যাকাউন্ট খুলি এবং প্ল্যাটফর্মটা ঘাঁটাঘাঁটি শুরু করি। প্রথমদিকে সবকিছু খুব জটিল মনে হলেও বুঝেছিলাম—এটাই হতে পারে আমার জীবনের নতুন শুরু।
প্রথম চ্যালেঞ্জগুলো
আমার যাত্রা শুরুই হলো এক ব্যর্থতার সাথে—প্রথম অর্ডারটা কাস্টমার ভুল করে প্লেস করেছিল, আর সেটা ক্যানসেল হয়ে গেল মিনিটের মধ্যে। মনটা ভেঙে গিয়েছিল। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই একটা নতুন অর্ডার পেলাম—একটি স্কুল ফ্লায়ার ডিজাইনের।
আমি ভাবছিলাম সহজ হবে, কিন্তু ক্লায়েন্ট ১০০ বারেরও বেশি রিভিশন চাইল! রাত জেগে ক্লান্ত শরীরে কাজ করেও আমি হাল ছাড়িনি। অবশেষে ক্লায়েন্ট কাজটা গ্রহণ করল এবং আমাকে টিপও দিল। ছোট সেই সাফল্যটাই আমাকে আত্মবিশ্বাস দিল—শান্ত মাথায় প্রফেশনাল মনোভাব নিয়ে কাজ করলে ভালো ফল পাওয়া যায়।
ঝুঁকি নেওয়ার সিদ্ধান্ত
কয়েকটা প্রজেক্ট শেষ করার পর আমি একটা বড় সিদ্ধান্তের সামনে দাঁড়ালাম—চাকরিটা রেখে দেব, নাকি পুরোপুরি Fiverr-এ ঝাঁপিয়ে পড়ব? সাহস আর বিশ্বাস নিয়ে আমি প্রাইভেট চাকরিটা ছেড়ে দিলাম, আর সম্পূর্ণ মনোযোগ দিলাম Fiverr-এ।
এটা বিশাল ঝুঁকি ছিল, কিন্তু সেটাই জীবনের সেরা সিদ্ধান্ত হয়ে দাঁড়ায়। এক বছরের মধ্যেই আমি হাজার হাজার প্রজেক্ট ডেলিভার করলাম, আর দ্রুত লেভেল ওয়ান থেকে লেভেল টু তে পৌঁছে গেলাম। জীবনে প্রথমবার নিজের কাজ নিয়ে গর্ব অনুভব করলাম, আর ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী হয়ে উঠলাম।
একটি জীবন বদলে দেওয়া মুহূর্ত
মার্চ ২০২০, যখন পুরো বিশ্ব COVID-19 এ লড়ছে, তখন Fiverr থেকে একটা নোটিফিকেশন পেলাম—আমি Top-Rated Seller হিসেবে নির্বাচিত হয়েছি।
সবার আগে আমি মাকে ফোন দিলাম। তাঁর আনন্দের সেই মুহূর্তটা অমূল্য ছিল। আজ তিনি আর বেঁচে নেই (আল্লাহ তাঁকে জান্নাত দান করুন), কিন্তু সেই দিনের তাঁর খুশির স্মৃতি আমি চিরকাল বুকে ধরে রাখব।
Fiverr কীভাবে আমার জীবন বদলে দিয়েছে
Fiverr আমার জীবনটাই বদলে দিয়েছে—আমার এবং আমার পরিবারের ভবিষ্যৎকে রূপ দিয়েছে। আমি ৫০০০+ প্রজেক্ট সফলভাবে শেষ করেছি, সবসময় নিজের সর্বোচ্চটা দিয়েছি।
যেসব স্বপ্ন একসময় কল্পনাও করতে পারিনি, সেগুলো সত্যি হয়েছে—পরিবারের জন্য জমি কেনা, বোনের বিয়ের আয়োজন, স্ত্রী ও সন্তানদের দেখাশোনা, এবং একটি স্থিতিশীল ও স্বাধীন জীবন গঠন করা।
Fiverr শুধু টাকা দেয়নি—স্বাধীনতা দিয়েছে, আত্মবিশ্বাস দিয়েছে, আর নিজের মতো করে জীবন গড়ার সুযোগ দিয়েছে।
নতুনদের জন্য বার্তা
সাফল্য একদিনে আসে না। কঠোর পরিশ্রম করতে হবে, ধৈর্য ধরতে হবে, আর Fiverr-এর নিয়মগুলো মেনে চলতে হবে।
একটা স্কিল বেছে নিয়ে সেটাতে এক্সপার্ট হতে হবে। ক্লায়েন্টদের সাথে সৎ থাকতে হবে। সময়মতো কাজ জমা দিতে হবে, স্পষ্টভাবে যোগাযোগ করতে হবে, আর প্রতিটি প্রজেক্টে নিজের সেরাটা দিতে হবে।
সব দিন সহজ যাবে না। কিছু অর্ডার কঠিন হবে, কিছু ক্লায়েন্ট চ্যালেঞ্জ দিবে—কিন্তু প্রতিটা অভিজ্ঞতা তোমাকে কিছু শেখাবে।
যদি তুমি নিয়মিত, নিবেদিত এবং Fiverr-এর গাইডলাইন ফলো করো, তাহলে সফলতা একদিন অবশ্যই আসবে—যেমনটা আমার জন্য এসেছে।
Inspired by Amjad's journey? Visit his Fiverr profile to explore his work and see how he does it.